-->
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

আজ শুধুই কাঁদব

[ বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু নিয়ে অজস্র লেখা আছে। কিন্তু এর ৯৯.৯৯% ভাগই হচ্ছে জ্ঞানী-গুণী-বিদগ্ধ জনদের অনুভূতি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো ছিল ছোটবড় সকলের। অবুঝ শিশু-কিশোর পর্যন্ত ছিল বঙ্গবন্ধুর নামে দেওয়ানা। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুতে তারাও প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছিল। এই লেখায় তেমনি এক কিশোরের ঠিক ঐদিনের মানসিক অবস্থাটা বর্ণনা করা হয়েছে। লেখাটি জাতীয় শোক দিবসে অর্থাৎ ১৫ই আগস্টে ছাপা হলে বেশী মানানসই হত। কিন্তু পেশাগত ব্যস্ততা আর শারীরিক অসুস্থতার জন্য দেরি হয়ে গেল। ] 
                         
আগস্ট ১৫, ১৯৭৫ ইংরেজি।   
আযানের সাথে সাথেই ঘুম ভাঙে খালেদের। দ্রুত শয্যা ছেড়ে নামাজ-কালাম পড়ে, গা-গোসল সেরে রীতিমত ফিটফাট হয়ে বসে আছে খালেদ। উত্তেজনায় একটু একটু কাঁপছেও বটে। দীর্ঘ দিনের লালিত মধুর স্বপ্নটি আজ বাস্তবায়িত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।         

: ভাল করে নাস্তা খেয়ে নে, খালেদ। সারাদিন অনেক দৌড়াদৌড়িতে ব্যস্ত থাকতে হবে। আম্মু বললেন নাস্তা বেড়ে দিয়ে। তারপরে খালেদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বললেন, তোকে বেশ মানিয়েছে । এক্কেবারে মিনি বঙ্গবন্ধু !

একটু লজ্জা পেল খালেদ। চেহারাটা আর একটু গম্ভীর করে ফেলল।
তারপরে মাথা নিচু করে নাস্তা খেতে থাকল। খাওয়ার ফাঁকে আর একবার আয়না দেখে নিল। আজ সে পরেছে তার প্রিয় ‘বঙ্গবন্ধু ড্রেস’। এ নামটা অবশ্য খালেদের দেয়া। গত ঈদে আব্বুর কাছে আব্দার করে বসে বঙ্গবন্ধু যেমন পরে, তেমন ডিজাইনের সাদা কাপড় দিয়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি বানিয়ে দিতে আর একটি কালো কোট দিতে।

এ প্লাস (A+)


মাহতাব মাস্টারের মন খারাপ, ভীষণ খারাপ।

নাহ, উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। তার কোন আপনজন মারা যায়নি, ঘরে কোন ধরনের চুরি-ডাকাতিও হয়নি। এমন কী মাসখানেক পরে তিনি যে অবসরে যাচ্ছেন, সেটা নিয়েও তার তেমন কোন মনকষ্ট নেই। মাহতাব মাস্টার একজন আদর্শবান শিক্ষক, ন্যায়ের প্রশ্নে চির কঠোর। এই ব্যাপারে গোটা জেলায় তার সুনাম আছে। অবশ্য তার কারণও আছে। একবার ছাত্রদের দুগ্রুপের মধ্যে মারামারি লাগলে স্থানীয় সাংসদপুত্র পিস্তল নিয়ে হাজির হয়। সবাই যখন ভয়ে ঠক্‌ ঠক্‌ করে কাঁপছিল, মাহতাব মাস্টার তখন বুক চিতিয়ে পিস্তলধারীর সামনে গিয়ে দাঁড়ান এবং কঠিন বকুনি দিয়ে তাকে ফেরত পাঠান। প্রায় নিশ্চিত এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে গিয়েও হয়নি।
 

সেই দৃঢ়চেতা মাহতাব মাস্টার ‘উত্তরপত্রে নম্বর প্রদান’ সংক্রান্ত বোর্ডের নির্দেশনামা নিয়ে এখন অকুল পাথারে হাবুডুবু খাচ্ছেন। অথচ পরীক্ষার খাতায় নম্বর দেবার বেলাতে তিনি আজীবন উদারহস্ত। যখন কোন খাতায় নম্বর খুব কম উঠতে থাকে, তিনি তখন প্রাণপণ চেষ্টা করেন এ প্রশ্নে সে প্রশ্নে এক-আধ নম্বর করে বাড়িয়ে দিয়ে ছাত্রটিকে পাস করিয়ে দিতে।

রক্তে ’৭১ঃ মুক্তিযুদ্ধের গল্প


খালেদের মনটা ভীষণ খারাপ। দেশে চলছে টানা অবরোধ আর হরতাল। স্কুল-কলেজ-ভার্সিটি-অফিস-আদালত- কল-কারখানা সবখানেই এক ধরণের অচলাবস্থা। সরকার কিম্বা বিরোধীরা কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না।মাঝখান দিয়ে নাভিশ্বাস ওঠছে আম-জনতার, বারো-তের পার হয়ে চৌদ্দটা বাজতে চলছে দেশের। মার্চ মাস, মানে স্বাধীনতার মাস এসেছে। কিন্তু কারো মধ্যে তেমন কোন উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে না। রাস্তাঘাটে সকলের মধ্যে কেমন যেন এক অজানা আতঙ্ক ভাব চোখে পড়ে, ঠিক যেমনটি ছিল ১৯৭১ সালে। ’৭১-এর কথা মনে পড়তেই খালেদ খুঁজে বের করল তার প্রিয় ডায়েরীটি।


খালেদের মনে পড়ল আনা ফ্রাংকের ডায়েরীর কথা। ওটা আজ বিশ্ব বিখ্যাত। আসলে ইহুদীরা জানে কার ঢোল কোথায়, কখন এবং কিভাবে পেটাতে হয়। অপকর্মে তারা বিশ্বসেরা । অথচ ওদের প্রতি বিন্দুমাত্র অবিচার হলে সেটা এমনভাবে ফলাও করে যে গোটা দুনিয়ায় ওদের প্রতি দরদ উথলে ওঠে। এজন্যই কি মসী অসির চেয়ে শক্তিশালী ?



                                                                                                                 
বিধ্বস্ত মন আর বিক্ষিপ্ত ভাবনা নিয়ে খালেদ ডায়েরীর পাতা ওলটাতে থাকে।  আচ্ছা, ওর এই ডায়েরী কি কখনো ছাপার অক্ষরে আলোর মুখ দেখবে! আনমনে হেসে ফেলে খালেদ।আরে দূ---র! মাথাটাই গোলমাল হয়ে গেছে। নচেৎ এসব বিদঘুটে ভাবনা আসছে কেন ? ও কী তেমন কেউ না কী যে ওর ডায়েরী কেহ ছাপাতে যাবে ? তাছাড়া বর্তমান প্রজন্মের কাছে একাত্তর কী আদৌ মূল্যবান কিছু ?  

তবে একলা চলো রে


ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি। ব্যক্তিগত রুমে নির্দিষ্ট চেয়ারে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে বসে আছি। তসলীম আরেফীন, ভার্সিটির দেয়াল পত্রিকার সম্পাদক, ক’দিন ধরেই তাড়া দিচ্ছে একটা লেখা দেবার জন্যে। দেখেছে যে, আমার এক-আধটু লেখালেখির অভ্যাস আছে। তাকে খুশি করার জন্য ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছি। কিন্তু ‘লিখবটা’  কী?  না আমি পেশাদার লেখক, না আমার আছে নজরুলের মতো প্রতিভা যে কলম ধরলেই হড় হড় করে লেখার ফোয়ারা ছুটবে! ভাবছি আর ভাবছি। ভাবতে ভাবতে ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছি। কখন যে চোখ দুটো বুজে এল টের পেলাম না।



: আসসালামু আলাইকুম।
বয়স্ক গলায় সালামের শব্দে চমকে উঠলাম। বেশ বয়স্ক দু’জন ভদ্রলোক প্রায় একসাথে রুমে ঢুকলেন। পরনে পায়জামা-পাঞ্জাবী। বয়সে আমাদের সাবেক উপাচার্য মহোদয়ের সমবয়সী হবেন। সম্মান প্রদর্শনের জন্য দাঁড়িয়ে দুটো চেয়ার এগিয়ে দিলাম।

জীন যখন বন্ধু

আসাদ ঘুমাচ্ছে।                                      
গভীর ঘুম।                                           
পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে কখন ঘুমাতে গেছে নিজেও জানে না। বাতি নিভিয়েছিল কী না, দরজা-জানালা ঠিকমত বন্ধ করেছিল কী না ইত্যাদি কিছুই বলতে পারবে না।                         
আসাদ ক্লাস এইটে পড়ে। বয়স তেরো। কিন্তু রুমে সে একাই থাকে। ছোটবেলা থেকেই ভীষণ দুঃসাহসী। ভয়-ডর ছাড়াই যেন তাকে তৈরি করা হয়েছে। দাদা বলেন, আসাদ আসলে আসাদ-ই (সিংহ)।

       
সেই গভীর ঘুমটা আচানক ভেঙ্গে গেল। মনে হচ্ছে গায়ের ওপর ভারী কিছু বসে আছে। বড় বড় মোলায়েম পশমের পরশ অনুভূত হচ্ছে। সিদ্ধান্ত নিল যে, চোখ কচলে ভাল করে দেখতে হবে। কিন্তু, একি! চোখ যে খোলা যাচ্ছেনা, হাত-ও নাড়তে পারছেনা। চোখ, হাত-পা সব কিছু যেন চেপে ধরে রাখা হয়েছে। নাকের ওপর ভারী শ্বাস পড়ছে। ভাল্লুক জাতীয় কোন জন্তু বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু ভাল্লুকের তো এতক্ষনে তাকে মেরে কেটে খেয়ে-দেয়ে সাবাড় করে ফেলার কথা। তা-ও করছে না। তবে কি ?             
জীন-ভুত?

চাই ‘হরতাল এবং অবরোধ’ মন্ত্রণালয়


একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী ছাত্র সেনা কর্তৃক আহুত একটি হরতাল ৩১/৮/২০১৪ তারিখে দেশব্যাপী (বনা কবলিত এলাকা বাদে) পালিত হয়েছে। দীর্ঘদিনের হরতাল খরায় আক্রান্ত এই দেশে হরতালটি সকলের কাছে মোটামোটিভাবে উপভোগ্য হয়েছে। তবে এই হরতালটির বিশেষত্ব এই যে, এটি ছিল শান্তিপূর্ণ এবং নিরুত্তাপ । কোথাও কোন ভাংচুর কিংবা জ্বালাও-পোড়াও জাতিয় ঘটনা ঘটে নি। হরতালের আগের রাতে কিংবা হরতালের দিনে ধর-পাকড়ের ঘটনা না ঘটায়, বুঝতে কষ্ট হয় না যে, হরতালে সরকারের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সমর্থন ছিল। উর্দু ভাষাতে প্রবাদ আছে, “আকল মন্দ কে লিয়ে ইশারায় কাফি হ্যাঁয়”। বিগত বৎসর সমূহের হরতালগুলোকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের ফলে আমার মনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ চিন্তার উদয় হয়েছে । দেশ ও জাতির কল্যাণে আমার এই চিন্তাধারাটি পরিবেশন করা অতীব জরুরী মনে করছি। 



গৌড় চন্দ্রিকা শেষ। এবারে শিরোনাম মোতাবেক আসল কথার পালা । তবে তার আগে অতীব জরুরী একটি কথা বলতেই হয় ।  অন্যথায়  ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপক সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না । কথাখানা আমার নিজকে নিয়ে ।

জ্বীনের থাপ্পড়

দীর্ঘদিন পর গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে মূসারা। আসলে দিন নয়, অনেক বৎসর বললে বিশুদ্ধ হবে। মূসারা বেশ কয়েকজন ভাই। মূসার বড় ভাইরা আসলেও, মূসা এবং তার ছোট ভাই ঈসা— এ দু’জন আগে কখনো গ্রামে আসেনি। সুতরাং আসার আগ থেকেই কৌতূহলে তাদের দম বন্ধ যাবার উপক্রম হয়েছিল। গ্রামে ঢোকার পর যেন তারা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো।



মূসাদের গ্রামটি খুব সুন্দর। গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবহমান বিখ্যাত ব্রহ্মপুত্র নদ। যদিও পলি জমে আর ভূমি দস্যুদের খপ্পরে পড়ে সে এখন শীর্ণকায়, কিন্তু পাড়ে দাঁড়ালে সহজেই উপলব্ধি করা যায় তার অতীত বিশালতা! অথচ এখন?
ছোট্ট ছোট্ট ডিঙি নৌকাতে মানুষ এপার-ওপার আসা-যাওয়া করছে, কোথাও কোথাও হেঁটেই পার হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দাদার কাছে শুনেছে যে একদা এই নদীতে বিশাল আকারের পাল তোলা নৌকা, এমনকি লঞ্চ-জাহাজ পর্যন্ত চলাচল করতো।

যখন এমন হবে....

( পর্ব ১ ) :   

সে অনেক অনেক দিন পরের কথা । 


ডক্টর আখদায়ুল কাজ্জাব। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের এক ডাক সাইটে অধ্যাপক। ‘Kajjab’s Conjecture’ আর  বিজ্ঞানী ‘হকিঙ-এর অসমাধিত কর্মের সমাধান’ এই দুটো বিষয় ভদ্রলোককে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে। তবে ভদ্রলোক কেবল বিজ্ঞানের নিরস শিক্ষক  নন; দেশের নানা সমস্যা নিয়ে তিনি প্রচুর মাথা ঘামান, লেখালেখি করেন, দিকনির্দেশনাও দিয়ে থাকেন। ‘ভুতের মুখে কেন রাম নাম’ ও ‘0 + 0 ≠ 0’ বই দুটো তাকে সর্বসাধারণ মহলে পরিচিত করেছে।  এ  কারণে দেশের ভিতরে-বাহিরে ভক্তের অভাব নেই তার। রাস্তায় বের হলে সালাম আর সম্ভাষণের জবাব দিতে দিতে ভদ্রলোক ক্লান্ত হয়ে পড়েন। অথচ এই বিশ্ববিখ্যাত ডক্টর সাহেবের ইদানীং বেশ কিছু রাত ধরে  ঠিকমত ঘূম হচ্ছে না। প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণায় দিন আর রাত গুলো পার করছেন। 


 
অবশ্য এই যন্ত্রণার কারণ না পারিবারিক, না পেশা সংক্রান্ত।  দীর্ঘদিন ধরে তিনি উপলব্ধি করে আসছেন যে, সমাজে একটি বড় ধরণের পরিবর্তন দরকার। আর সেই পরিবর্তনটা হতে হবে মানুষের চিন্তায়-চেতনায় ও কর্মে। ‘ বদলে যাও, বদলে দাও’ স্লোগানটা সেই শিশুকাল থেকে শুনে আসছেন। কিন্তু বদলাল আর কৈ ?  কিন্তু মৌলিকভাবে কি পরিবর্তনটা দরকার ? এটা ভাবতে ভাবতেই ভদ্রলোকের ঘুম গেছে গোল্লায়। রাত দিন এটা সেটা পড়ছেন, ভাবছেন আর কাপের পর কাপ কফি পান করছেন। কিন্তু কোন সিদ্ধান্তে পৌছতে পারছেন না।

আহা, কী আনন্দ ! (হবুরাজা নিয়ে গল্প)


[লেখকের কথাঃ গল্প-কবিতা-উপন্যাস তথা সাহিত্যে এমন কিছু চরিত্র আছে, যেগুলো  মোটেও ঐতিহাসিক নয়; কিন্তু অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের চেয়েও ঢের মশহুর। উদাহরণস্বরূপ কার্টুন জগতের  টোকাই, চাচা চৌধুরী; রহস্য সাহিত্যে মাসুদ রানা, কিরীটী রায়, টারজান; ছোটগল্পে ফটিক, জোহরা; উপন্যাসে হিমু, মিসির আলী, মজিদ, কাদম্বিনী  ইত্যাদি এবং আরও অনেক অনেক চরিত্রের নাম করা যায়। তেমনি আর একটি চরিত্রের নাম ‘হবুরাজা’। অথচ এই অতি  বিখ্যাত চরিত্রটি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে মাত্র দুটো কবিতা পাওয়া যায়ঃ ‘জুতা আবিষ্কার’ (রচনায়ঃ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) এবং  ‘হবুচন্দ্ররাজা’ ( রচনায়ঃ সুনির্মল বসু )। অতএব, হবুরাজাকে নিয়ে কিছু একটা রচনা  করার শখ জাগল। ‘ আহা, কী আনন্দ !’  গল্পটি সেই শখের বহিঃপ্রকাশ। সার্থকতার বা ব্যর্থতার বিচারের ভার পাঠকের। তবে একটা কথা বলে রাখি, এটা শুধু গল্প। পাঠককে আনন্দ দেবার জন্য একটি নগণ্য প্রয়াস। এর সাথে রাজনীতির দূরতম সম্পর্কও নেই। সুতরাং, যদি কোথাও কোন মিল পরিলক্ষিত হয়, সেটা স্রেফ কাকতালীয়। উহাকে ক্ষমাসুন্দর ও সাহিত্যসুলভ দৃষ্টিভঙ্গিতে গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ রইল। ]  
  

(১ম পর্বঃ  ২২ মার্চ ২০১৪ ) 
 
নাগরপুর রাজ্যের মহা প্রতাপান্বিত রাজা হবুচন্দ্র। অফিসিয়ালী তার নামটা এভাবে লেখা হয় নাগরপুর রাজ্যের জল-স্থল --অন্তরীক্ষের মহান রাজাধিরাজ ফিল্ড মার্শাল হবুচন্দ্র দ্য গ্রেট । তার দাপটে বাঘে আর  ছাগলে এক ঘাটে  জল খায় না বটে, কিন্তু পুলিশ আর ফেরারী আসামী গলাগলি  করে হাটে। 

অঝোর ধারায়

মুক্তার মনের আনন্দ আর বাঁধ মানছে না আজ। জীবনে দুটো দিন বাদে এত আনন্দ আর কবে পেয়েছিল! হ্যাঁ, ঐ দুটো দিনের কথা অবশ্যই আলাদা। শুধু তার একারই নয়, মুক্তা মনে করে, দুনিয়ার সব মেয়েদের ক্ষেত্রেই দুটো বিশেষ দিন আছে। প্রথমটি হচ্ছে  বিয়ের দিন। ঐ দিন সে মানিকের বউ হয়ে এ ঘরে আসে। তখন অনুভব করেছিল যে,  তার  মেয়ে জনম সার্থক। অকূলপাথারে সে আর একা নয়। তার জীবন নৌকার মাঝি আছে । দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠতম খুশীর দিনটি ছিল বাবুর মা হবার দিন। উপলব্ধি হল যে এতদিনে তার নারী জনম পরিপূর্ণতা পেল।
: বৌ মা, জলদি যাও। পানির কাজ কম কর।বাবুর ঠাণ্ডা লেগে যাবে।
: মা, এখনি আসছি। শাশুড়ি তহুরা বেগমের ডাকে মুক্তা সাড়া দেয়।

তহুরা বেগম বিধবা, বয়স ষাটের কাছাকাছি। শখের হোমিও তাক্তার। তবে হাতযশটা বেশ ভাল। এলাকাতে সবাই এক নামে চেনে। এতক্ষণ বাবুকে কোলে নিয়ে আদর করছিলেন। এইমাত্র শুইয়ে দিয়ে নিজের রুমে ফিরে যাচ্ছেন। হার্টের রোগী। নিয়ম মেনে চলেন।
: আপা,  আপনি যান তো। এবারের তাগাদাটা এল ময়নার মার তরফ থেকে।

০২-০৩-৭১

আজাদের চোখে ঘুম নেই। রজনী গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। অথচ আজাদ বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে, থেকে থেকে উঠে বসছে, আবার শুয়ে পড়ছে। কেন? কিসের জন্য? আজাদ কিছুই বুঝতে পারছে না। কেবল হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা টর্নেডোর আভাস পাচ্ছে। এ যেন এক প্রলয়ঙ্কারী সাইক্লোন, সব কিছু ভেঙ্গে-চুরে চুরমার করে দেবে । কিন্তু কী করে সম্ভব! আজাদ মাত্র কৈশোরে পদার্পণ করেছে, বয়স এখনো তেরো হয়নি।
আগামীকাল যেন কয় তারিখ? ২রা মার্চ, ১৯৭১ সাল। মিছিলে যেতে হবে।  যেমন করেই হোক, যেভাবেই হোক।
: কি রে, বাবা! ঘুম থেকে উঠবি না?
মায়ের ডাকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বিছানায় উঠে বসলো আজাদ। টেবিল ঘড়িটার দিকে তাকালো। সাড়ে  আটটার মতো বাজে। শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে। অনেক রাত করে ঘুমানোর জের। মিছিল কি শুরু হয়ে গেছে? প্রশ্নটা মনে জাগতেই সব অলসতা নিমিষে উড়ে গেল। ঝটপট হাত মুখ-ধুয়ে নাস্তা খেতে বসলো।

একটি ছবির জন্য

ডায়েরির মলাটে ময়লার পুরু আস্তর জমে গেছে, পাতাগুলোও বেশ বিবর্ণ। বুঝা যায় যে অনেকদিন ধরা- ছোঁয়া হয়নি।
ওটা খালেদের ডায়েরি। ঠিক ডায়েরি নয়, ওটা তার কাছে সাত রাজার ধন। বাবার কাছ থেকে আবদার করে সে ডায়েরিটা চেয়ে নিয়েছিল।  কিন্তু সেটা সম্প্রতি বা দু’এক বছর আগে নয়। আজ থেকে বিয়াল্লিশটি বৎসর আগে অর্থাৎ সেই রক্তঝরা ১৯৭১ সালে। ও-  তখন অনে-ক ছোট, বয়সটা ছিল দশের নিচে। বাবাকে প্রায় দেখত রাতের বেলা ঘুমানোর আগে কাল  মলাটের একটি খাতায় কি যেন লিখছে। জিজ্ঞেস করাতে বাবা একদিন ডায়েরির ব্যাপারটি বুঝিয়ে বলল। দু’দিন পরে খালেদের ডায়েরি লেখার শখ জাগল। আব্দার করতেই বাবা সবুজ মলাটের সুন্দর একটি  ডায়েরি কিনে দেয়। উৎসাহের চোটে প্রথম কয়দিন বেশ লেখা হয়। তারপর আর উৎসাহ ধরে রাখতে পারে নি। মাঝে মধ্যে লিখতে বসত, তাও বিশেষ কোন ঘটনা ঘটলে।

গোটা ১৯৭১ সালের ২০-২২ টি ঘটনা লেখা আছে। তারপর আর ডায়েরি লেখার কোন আগ্রহ খালেদের মাঝে তৈরি হয়নি। তাই আর কেনাও হয়নি। সেই বিশেষ ডায়েরি খানাই সযত্নে রেখে দিয়েছে। মাঝে মাঝে নামিয়ে পড়ে, অন্যকেও শুনায়। আজ আবার নামাল, তবে অনেক অনেক দিন পরে। উল্টাতে উল্টাতে এক জায়গায় এসে দৃষ্টি আটকে গেল। সেই কাঁচা হাতে একটি ঘটনা লেখা। তবে শিরোনামও দেয়া আছে। শিরোনামটা দেয়ার আগে বেশ কাটাকুটিও আছে। অর্থাৎ শিরোনামটা ঠিক করতে তাকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। শেষমেশ গৃহীত শিরোনামটি : একটি ছবির জন্য। 
                             
খালেদ পড়তে শুরু করে, যদিও এর আগেও অনেক বার পড়া হয়েছে।
 ঘটনাটি সংক্ষেপে লেখা । কিন্তু পড়া শুরু করা মাত্রই ঐ দিনের সব কিছু ছবির মত তার সামনে ভাসতে থাকে। প্রতিবারই এমনটি হয়। আজও তাই হল।

১৫ ই আগস্ট, ১৯৭১ সাল। সকাল সোয়া ৯ টার মত বাজে।                                           
: কি রে খালেদ, স্কুলে যাবি না ?                                       
: হ্যাঁ, মা যাব। এখুনি রেডি হচ্ছি।
                                 
মার ডাকে সাড়া দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে খালেদ প্রস্তুত হয়ে নেয়। দ্রুত কয়েক লোকমা ভাতও খেয়ে নেয়। ঘর থেকে বের হওয়ার আগে স্কুলের ব্যাগটা খুলে দেখে নেয় সব কিছু ঠিকঠাক মত আছে কি না।

অচেনা মন

“ ওরা রাজাকার । ছয়জনের একটি দল। এলাকার মানুষ ওদেরকে এড়িয়ে চলে। ভয়ে এবং ঘৃণায় । পাক হানাদার বাহিনী এলাকাতে এসেছিল ৮-৯ মাস আগে। এলোপাথারী ধ্বংস যজ্ঞ চালিয়ে থানা সদরে চলে যায়। মাঝে মধ্যে আসে, দু’একটা চক্কর মেরে যায়। সর্বসাধারণ সতর্ক হওয়ার একটা সুযোগ তবু পায়। কিন্তু এই রাজাকারের দল! ওদের কথা না বলাই ভাল। হেন কোন অপকর্ম নেই, যা গত কয়েকমাসে ওরা করে নাই। আমি অবশ্য স্বচক্ষে কিছু দেখি নাই। বেশীরভাগ শুনেছি দোকানদার দুলু চাচার কাছ থেকে। আরো দু’চার জনেও আমাকে কিছু কিছু জানিয়েছে। বয়সে ছোট। নচেৎ হয়তো আর অনেক কিছু জানা যেত।”

কথাগুলো খালেদের ডায়েরীতে লাল কালিতে লেখা। রাজাকারদের প্রতি খালেদের প্রচন্ড ঘৃণা। বাবা বলেছিল, ”বাহার ভাই-কে স্থানীয় রাজাকাররা পাক বাহিনীর হাতে ধরিয়ে দেয়। পরে পাক-বাহিনীর নির্মম নির্যাতনে বাহার ভাই শহীদ হয় । ” নভেম্বরের শেষ দিকে খবর আসে যে, বাহার জেঠার একমাত্র ছেলে তারেক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়ে গেছে। চারটে মেয়ে নিয়ে জেঠি যে এখন কী করবে। ঐ বয়সে ছোট্ট খালেদের ভাবনা তালগোল পাকিয়ে যেত।
কিন্তু মানুষ যা চায় সর্বদা যদি তাই ঘটত, তবেতো বিধি বলে কিছু থাকত না! 

*** *** *** ***

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৩ সাল। বিজয় দিবস ।
গাজীপুর জেলায় গজারী বনের ধারে এক নিভৃত গ্রাম। উঠোনে চাঁদর গায়ে আরাম কেদারায় বসে খালেদ পৌষের মিষ্টি রোদ উপভোগ করছে। হাতে তার সেই সবুজ মলাটের ডায়েরীটি যাকে বিগত বিয়াল্লিসটি বৎসর যাবৎ যক্ষোর ধনের মত সে যত্ন করে আলগে রেখেছে। প্রতিটি বিজয় দিবসেই খালেদ একই কাজ করে। পড়তে পড়তে প্রায় মুখস্থ হয়ে গেছে। তারপরও নজর বুলাতে থাকে।

জয় পরাজয়

অপরূপ সুন্দর এক বন! এত বেশী সুন্দর যে একবার এক মানুষ সে বনে ঘুরতে গিয়েছিল। সে এতই মুগ্ধ হয়েছিল যে, প্রাণমাতানো এক কবিতা লিখে ফেললঃ
কোন্ বনেতে জানি নে ফুল গন্ধে এমন করে আকুল,
কোন্ গগনে ওঠে রে চাঁদ এমন হাসি হেসে।
আঁখি মেলে তোমার আলো প্রথম আমার চোখ জুড়ালো,
ওই আলোতেই নয়ন রেখে মুদব নয়ন শেষে॥
শুধু যে প্রাকৃতিক ভাবে সুন্দর তাই নয়, বনের বাসিন্দারাও খুব ভাল। বনে কোন বাঘ- ভাল্লুক-সিংহ নেই, আছে প্রধানতঃ গরু-মহিষ-ভেড়া-ছাগল। আর আছে অনেক অনেক হরিণ। দু’ চারটে ঘোড়াও আছে। একটি ঘোড়া খুবই দুরন্ত দুর্বার। ওটাকে বাকিরা রাজা হিসাবে মেনে নিয়েছে। ঘোড়া যেহেতু তৃণভোজী প্রাণী, তার দ্বারা কারো আক্রান্ত হওয়ার আশংকা প্রায় শূন্য ।


এ সকল বাসিন্দাদের পরস্পরের মধ্যে কোন হিংসা বিদ্বেষ নেই, আছে কেবল সৌহার্দ্য ।

বাবার কাঁধে

রাস্তার মাথায় একটি সুবিশাল সাইনবোর্ড। নতুন, সম্ভবতঃ কাল রাতে লাগানো হয়েছে। তাতে বড় বড় হরফে লেখাঃ জুন মাসের ৩য় রবিবার আজ বাবা দিবস বাবাকে তার প্রিয় জিনিসটি উপহার দিন সেলিম সাহেব একজন বাবা। তার নজরটা সাইনবোর্ডটির ওপর পড়ল। লেখাটাও মনের অজান্তে পড়া হয়ে গেল । কিন্তু তারপর ? ফেল ফেল করে তাকিয়ে থাকলেন । তাকিয়েই থাকলেন। সবকিছু যেন অর্থহীন ঠেকছে। * * * * * * বত্রিশটি বছর আগের কথা। মাস দিন তারিখ সব মিলে গেছে। তফাৎ কেবল ক্ষণটাতে। পুরোপুরি কাকতালীয় হয়েও হল না। আসলে কাকতালীয় বলে কিছু নেই। সবই বিধাতার ইচ্ছা। সেদিন বাদ এশা। সেলিম সাহেব অস্থির চিত্তে বারান্দায় পায়চারী করছেন। আড়াই বছরের মনিরকে পাশের রুমে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছেন। ওদিকে আঁতুড় ঘর থেকে মুনিরের মার কোঁকানির আওয়াজ আসছে। ঘণ্টা দুই হবে, প্রসব বেদনা উঠেছে। সেলিম সাহেবের অস্থিরতা কেবল বাড়ছে আর বাড়ছে। এক সময় বড় আপা বের হয়ে আসেন। কিন্তু কিছু বলার আগেই নবজাতকের কান্নার আওয়াজ সেলিম সাহেবের কানে প্রবেশ করে। মনিরের বোন হয়েছে। খুব সুন্দর। হাসিমুখে শুধান বড় আপা। শুকরিয়া , সব খবর ভাল তো ? জি, ভালো। আপনি এবার ঘুমাতে যান। আমরা সবাই আছি। 


* * * * * * মনিরের বোন বড় হচ্ছে। আদর করে নাম রাখা হয়েছে মনিরা । শৈশব পেরিয়ে স্কুলে ভর্তি হল। তারপরে একে একে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করল। বিয়ে হল।