Join Us On Facebook

Please Wait 10 Seconds...!!!Skip

আল-কোরআনে বিজ্ঞান অন্বেষণ

(১) 
     
     গোটা বিশ্ব জাহানের একমাত্র লা-শরীক মহান প্রভু আল্লাহ্‌ পাকের তরফ থেকে তাঁর শ্রেষ্ঠতম সৃষ্টি মানুষের প্রতি প্রদত্ত শ্রেষ্ঠতম দান নিঃসন্দেহে ‘আল-কুরআনুল কারীম’। মহান ও অতুলনীয় এই গ্রন্থের সংস্পর্শে যারা না এসেছে তারা অন্তহীন দুর্ভাগ্যের অধিকারী। মহাপবিত্র এই গ্রন্থের অগণিত বৈশিষ্টের মধ্যে একটি এই যে, “ ইহা সব ধরণের জ্ঞানের আঁধার।” কিন্তু এই জ্ঞান আহরণ করা কি এতই সহজ ?



     বর্তমান যুগকে বলা হয় বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার যুগ। তাত্ত্বিক এবং প্রায়োগিক, উভয় ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের নিত্য নতুন আবিষ্কারের প্লাবনে জগত ভেসে যাচ্ছে। পাশাপাশি বর্তমানে পবিত্র কুরআন শরীফের চর্চাও লক্ষণীয় হারে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে আধুনিক শিক্ষিতদের মধ্যে এই বিষয়টি খুব বেশী পরিমাণে দৃষ্টিগোচর হয়। কিন্তু ইহাদের অনেকের মধ্যে একটি অদ্ভুত প্রবণতা বেশ ভালভাবেই চোখে পড়ে। তারা এ কথা প্রমাণ করার জন্য বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠে যে, বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কার সমূহ যথাঃ বিদ্যুৎ, চুম্বক, আলো, মহাকর্ষ তত্ত্ব, আপেক্ষিক তত্ত্ব, বিগ-ব্যাংগ তত্ত্ব, ডিএনএ কোড ইত্যাদির কথা পবিত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত আছে।
অথচ বিগত শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত আশরাফ আলী থানভী (রঃ)-এর দৃষ্টিতে এই প্রবণতা স্রেফ এক ধরণের পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়।

    মাওয়ায়েজে আশ্রাফিয়াতে এ বিষয়ে তিনি খুব কড়া মন্তব্য করেছেন। আঁতেলরা হয়তো চাইবেন হযরত থানভী (রঃ)-র বক্তব্য তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে; কিন্তু তাদের জানা উচিত যে হযরত থানভী (রঃ)-র গোটা জিন্দেগী ব্যয় হয়েছে কুরআন-হাদীসের পেছনে। সুতরাং কুরআন-হাদীস যদি তিনি না বুঝেন, তাহলে কি ঐ সকল ব্যক্তিরা বেশী বুঝবেন যারা অন্য কাজে জিন্দেগীর সবটুকু মেধা–পরিশ্রম ব্যয় করার পর নিতান্ত শখের বসে কুরআন-হাদীসের চর্চায় নেমেছেন ?
কেহ কেহ হয়তো বলতে চাইবেন যে, পবিত্র কুরআন শরীফে বৈজ্ঞানিক বিষয় সম্পর্কিত যে ৭৫০-৮০০ আয়াত আছে উহার তাৎপর্য কি ? এই প্রসঙ্গে দিকপাত করার পূর্বে জরুরী কয়েকটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।

প্রথমতঃ বিজ্ঞান সংক্রান্ত ঐ সকল আয়াত সমূহ কার উপর নাযিল হয়েছিল ?
 নিশ্চয়ই, জনাবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর ।
 দ্বিতীয়তঃ কাহাদের সম্মুখে নাযিল হয়েছিল ?
 নিশ্চয়ই, হযরত সম্মানিত সাহাবীগণের সম্মুখে।
 তৃতীয়তঃ ঐ আয়াত সমূহের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কর্তব্য কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবী (রাঃ) সম্পাদন করেছিলেন ?
ইহার উত্তর গোটা উম্মতের ‘ইজমা’ অনুযায়ী ‘হ্যাঁ’।


মহান সাহাবীরা ছিলেন গোটা সৃষ্টি জগতের মধ্যে হযরত আম্বিয়া আলাইহিস সালাম গণ বাদে সবচাইতে সরল জনগোষ্ঠী। যে কোন বিষয় নিয়ে তাদের মনে খটকার উদ্রেক হলে তারা সরাসরি সে বিষয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে অবহিত করতেন এবং জনাব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে জওয়াবই পেশ করতেন, তারা সেটা বিনা দ্বিধায় মেনে নিতেন।

     কয়েকটি উদাহরণ উপস্থাপন করছি।

(১) জনৈক সাহাবীর মনে কৌতূহল জাগায় তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রশ্ন করেন যে কেন ছেলে হয় এবং কেন মেয়ে হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেন ।
(
২) অপর এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট জানতে চান যে জান্নাতে কৃষিকাজ করা যাবে কি না। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ প্রশ্নেরও যথাযত উত্তর প্রদান করেন।
(
৩) অন্য এক সাহাবী জনাব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট এসে স্বীকার করেন যে তিনি রমযান মাসে দিনের বেলাতে স্ত্রী-সহবাস করে ফেলেছেন, এখন কি কর্তব্য। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সমস্যারও সমাধান দেন । 


     লক্ষ্য করুন যে, বর্ণিত উদাহরণ তিনটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরণেরঃ প্রথমটি বিজ্ঞান সংক্রান্ত, দ্বিতীয়টি পরকাল সংক্রান্ত এবং তৃতীয়টি মাসআলা (কিংবা কর্তব্য) সংক্রান্ত। এরূপ আরো অজস্র নমুনা পেশ করা যায়। এবং সবগুলো থেকে এই বিষয়টি দিবালোকের মত প্রতীয়মান হয় যে সাহাবীদের অন্তরে উদিত ইহলৌকিক বা পারলৌকিক যে কোন সমস্যার সমাধানের জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তরফ থেকে প্রদত্ত নির্দেশনাই ছিল তাদের জন্য চূড়ান্ত জওয়াব। অতঃপর ঐ জওয়াবের যথার্থতা কিম্বা উক্ত জওয়াব বাস্তবায়ন করা সহজ নাকি কঠিন ইত্যাদি নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না ।

যারা দাবী করেন যে , আল্লাহ্‌ পাক কুরআন শরীফে ‘ ইয়াতাফাক্কারুন’, ‘ইয়াতাদাব্বারুন’ ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে বিজ্ঞান চর্চার প্রতি উৎসাহিত/আলোকপাত করেছেন, তাদের প্রতি সবিনয়ে বলছি যে এটা তাদের মনের কষ্টকল্পিত ভাবনা। প্রকৃত ব্যাপার ভিন্ন জিনিস।


একটি হাদীস উল্লেখ করছি।
     হযরত বারায়া (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, আমি হযরত আয়েশা(রাঃ)র নিকটে গিয়া বললাম, “ আপনি রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যে অলৌকিক অবস্থা দেখেছেন, তাহা আমাকে বর্ণনা করুন।” ইহাতে মা আয়েশা(রাঃ) কাঁদতে লাগলেন এবং বললেন, “ তাঁহার সকল কাজই অলৌকিক। একরাতে তিনি আমার নিকটে এসে শয়ন করলেন, এমনকি তাঁহার পবিত্র দেহ আমার শরীরের সাথে স্পর্শ করল। অতঃপর তিনি বললেন, “ হে আবু বকরের কন্যা ! আমাকে ছেড়ে দাও। তুমি কি আমার রবের ইবাদাত করবে ? ” আমি ( অর্থাৎ হযরত আয়েশা (রাঃ) ) বললাম, “ আপনার সংসর্গে আমি কিছুক্ষণ অতিবাহিত করতে ইচ্ছা করি, কিন্তু আপনার ইচ্ছাকেই আমি ভালবাসি।” তারপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওযু করতঃ নামাযে দাঁড়ালেন। নামাযের মধ্যে তিনি এত অধিক পরিমাণে ক্রন্দন করতে লাগলেন যে, তাঁহার পবিত্র বক্ষ পর্যন্ত ভিজে গেল। রুকুতে এমনকি সিজদাতে গিয়েও তিনি ক্রন্দন করলেন। তারপর তিনি পবিত্র মস্তক উত্তোলন করেও কাঁদতে থাকলেন। এইরূপ ক্রন্দনরত অবস্থাতে হযরত বেলাল(রাঃ) এসে তাঁহাকে নামাযের জন্য ডাকলেন। আমি তখন জিজ্ঞাসা করলাম, “ ইয়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি কেন কাঁদছেন ? মহান আল্লাহ্‌ পাক তো আপনার অতীত-ভবিষ্যৎ সবই ক্ষমা করে দিয়েছেন।” তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না ? আমি কেন ক্রন্দন বন্ধ করব ? আল্লাহ্‌ পাক আমার প্রতি এই আয়াত নাযিল করেছেন, “ নিশ্চয় আসমান ও জমিনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি দিনের আবর্তনে নিদর্শন রয়েছে ......।”( ৩ : ১৯০ ) ”।
[ সহীহ ইবনে হাব্বান, ইবনে যওযী; ইমাম মুসলিম(রঃ)ও সংক্ষিপ্তাকারে এই হাদীস বর্ণনা করেছেন।]

     যে সকল ভাইয়েরা কুরানুল কারীম থেকে বৈজ্ঞানিক তথ্য-তত্ত্ব বের করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, তারা প্রায়ই তাদের স্বপক্ষে ৩ : ১৯০ নং আয়াতটি হাজির করেন। সেই সকল ভাইদের বলছি, আপনারা উদ্ধৃত হাদীসের আলোকে উপলব্ধি করে দেখুন যে ৩ : ১৯০ নং আয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে জনাবে মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এর ভূমিকা কী ছিল। এরূপে অন্যান্য আয়াতসমূহ যেগুলোকে আপনিবৈজ্ঞানিক তত্ত্ব সম্বলিত’ বলে মনে করছেন, যে সকল আয়াত শরীফে ‘ইয়াতাফাক্কারুন’, বা ‘ইয়াতাদাব্বারুন’ বা অনুরূপ শব্দ রয়েছে, ঐ সকল আয়াত নাজেল হওয়ার পর জনাব রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এবং সাহাবী (রাঃ) –গণের আমল তালাশ করে দেখুন। প্রথাগত (traditional) বৈজ্ঞানিক গবেষণার দিকে জড়িত হয়েছে, এমন একটি নজীরও আপনি খুঁজে পাবেন না। আল কুরআনে যে বারংবার ‘চিন্তা/ফিকর’ ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে, সম্মানিত সাহাবী গণ খুব ভালভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে ঐচিন্তা/ফিকর’ বলতে কি বুঝায়, উহার স্বরূপ এবং সীমা। শুধু তাই নয়, কুরআনের সে দাবী তারা যথাসাধ্য (এবং নিশ্চয় উহা আর যে কোন ব্যক্তি বা জনগোষ্ঠীর চেয়ে বেশী পরিমাণে) আদায়ও করে দিয়েছেন। এখন নির্বোধের মত কেহ বলতে বা ধারণা করতে পারে যে, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাবে সাহাবীগণ ঐ সকল আয়াত সমূহের ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন। ওদের জন্য আফসোস করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।


(২)
     সম্মানিত মুফাসসিরগণ লক্ষ্য করেছেন যে পবিত্র কুরআন শরীফের আয়াতসমুহকে মোটামোটি ভাবে ৪টি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়ঃ
 (১) আকাইদ বা বিশ্বাস সম্পর্কিতঃ এই সকল আয়াতের প্রধান আলোচ্য বিষয় তিনটি ----- তাওহীদ ( আল্লাহ্‌র একত্ববাদ ), নবুওয়াত ( আল্লাহ্‌ পাক কর্তৃক বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে নবী হিসাবে মনোনীতকরণ ) ও আখিরাত ( মৃত্যু পরবর্তী জিন্দেগী )।
(২) আহকামাত সম্পর্কিতঃ এই ধরণের আয়াতসমুহে বিবিধ মাসায়েল যথাঃ জায়েজ-নাজায়েজ, হারাম-হালাল ইত্যাদি আলোচনা করা হয়েছে।
(৩) কাচাচ বা ঘটনা সমূহঃ বিভিন্ন আম্বিয়া আলাইহিস সালাম গণের ঘটনাবলী।
(৪) আমসাল বা উদাহরণ সমূহঃ হক-বাতিলের পার্থক্য বোধগম্য করানোর জন্য নানা ধরণের উদাহরণ দেয়া হয়েছে। 

     তাওহীদ অর্থাৎ মহান আল্লাহ্‌ পাক যে গোটা বিশ্বের একমাত্র ‘ইলাহ’ এই বিষয়ের বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি অনেক স্থানে তারই সৃষ্ট প্রাকৃতিক জগতের বিভিন্ন নিয়মাবলী তুলে ধরেছেন। এই জাতীয় আয়াত সমূহের সংখ্যা ৭০০-৮০০ এর মত। স্রষ্টা হিসাবে মহান আল্লাহ্‌ পাক নিখুঁতভাবে জানেন যে প্রাকৃতিক নিয়মাবলীর অন্তর্নিহিত আসল রূপ কি এবং যেহেতু স্রষ্টার বর্ণনায় অর্থাৎ আল-কুরআনে কোন ভুল নেই , অতএব, বিশ্ব প্রকৃতি সম্বন্ধীয় বা সম্পর্কিত যে সমস্ত তথ্য বা তত্ত্ব আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ঐগুলো ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে । বিজ্ঞান যদি উন্নত হতে হতে কোন বিষয়ে প্রকৃত সত্যের নাগাল পায়, তাহলে বিজ্ঞানের আবিষ্কার স্বাভাবিকভাবেই স্রষ্টার বর্ণনার সাথে মিলে যাবে। যেমন, পাখীর ওড়ার ব্যাপারে বিজ্ঞান যদি আসল সত্য জানতে পারে তাহলে সে অবশ্যই বলতে বাধ্যঃ “ তাদেরকে ( অর্থাৎ পক্ষীকুলকে ) কেহই (আকাশে) ধরে রাখে না, রহমান ( অর্থাৎ আল্লাহ্‌ ) ব্যতীত ( ৬৭ ঃ ১৯ ) ।” 

     কিন্তু বিজ্ঞান এখনো ঐ পর্যায়ে পৌঁছতে পারে নি। তাই সে ( বিজ্ঞানের অন্যতম শাখা ) বলবিদ্যার সাহায্যে পাখীর ওড়ার ব্যাপারে বিভিন্ন ব্যাখ্যা পেশ করে। তবে এই ব্যাখ্যা গুলো যে ষোল আনা ভুল নয়, তার প্রমাণ এই সমস্ত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের উপর ভিত্তি করে মানুষ উড়োজাহাজ তৈরি করতে পেরেছে। এই আপাতঃ সফলতার কারণে বিজ্ঞানীরা তাদের ব্যাখ্যাকেই চরম সত্য বলে ধরে নিচ্ছেন। এই যে বিরোধিতা, বিজ্ঞানীদের মতে তাদের ব্যাখ্যাই চরম সত্য; আর আল-কুরআন তো ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে; এর কোন সুরাহা আছে কি?

আপাতদৃষ্টে জটিল এই সমস্যাটির সমাধান কিন্তু খুবই সহজ এবং সুন্দর। প্রথমে বুঝা দরকার যে এখানে ভিন্ন ভিন্ন দুটো বিষয় জড়িতঃ
(১) প্রাকৃতিক কানুন এবং
(২) প্রাকৃতিক কানুনের রহস্য বা হাকিকাত।

     বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামান প্রাকৃতিক কানুন নিয়ে । পক্ষান্তরে আল-কুরআন বর্ণনা করছে প্রাকৃতিক কানুনের রহস্য বা হাকিকাত। মহান আল্লাহ্‌ পাক মানুষকে আশরাফুল মাখলুকাত করতঃ এই পরিমাণ ক্ষমতা দিয়েছেন যে বিশ্ব প্রকৃতির অনেক রহস্যই সে জ্ঞান-গবেষণার মাধ্যমে জানতে সক্ষম । অধিকন্তু এই জন্য যে তাকে মু’মিন বা মুসলমান হতে হবে এমন কোন কথা নেই। আল্লাহ্‌ প্রদত্ত প্রতিভা থাকলে এবং রাত দিন চেষ্টা করলে (জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে) যে কেহ বিশ্ব-প্রকৃতি তথা প্রাকৃতিক কানুন সম্পর্কীয় দু’একটি আবিষ্কারের অধিকারী হতে পারে। তাই দেখা যায়, পদার্থ-রসায়ন-জীববিদ্যা-মনোবিজ্ঞান-কৃষিবিজ্ঞান তথা বিজ্ঞানের সকল শাখায় (আজ পর্যন্ত কৃত) প্রায় সকল আবিষ্কারই সম্পন্ন হয়েছে অমুসলিম যেমন ইহুদি-খৃষ্টান কিংবা নাস্তিক কর্তৃক। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় যে Newton – Gauss -Harvey – Edison খৃষ্টান, Einstein-Ottohan ইহুদী , Satten Bose হিন্দু এবং Abdus Salam কাদিয়ানী ছিলেন। বর্তমানে জীবিত বিজ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হিসাবে যাকে ধরা হয়, সেই Stephen Hawking একজন নাস্তিক । একথা অনস্বীকার্য যে আজকের এই বিজ্ঞানের যুগ এদের (এবং এরূপ আরো অনেকের কাছে) চির ঋণী। প্রাকৃতিক আইন সম্পর্কীয় নানান তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কারে এদের অবদান চির অম্লান। 

     কিন্তু এরা কেহই প্রাকৃতিক আইনের আড়ালে যে হাকিকাত লুকায়িত, তার নাগাল পান নি। পান নি বলেই এরা মুসলমান হতে পারেন নি। কেহ কেহ পিতৃ ধর্ম আঁকড়ে ধরেছেন, কেউ কেউ ধর্ম-কর্ম ছেড়ে দিয়ে শুধু আস্তিকের দরজায় পড়ে রইলেন, আর কেউতো পুরোপুরি নাস্তিকই বনে গেলেন। কারণ বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য যে পদ্ধতি, উহার মাধ্যমে প্রকৃত সত্যকে জানা সম্ভবপর নয়। যদি সম্ভব হত, তবে পৃথিবীতে হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম গণকে পাঠানোর প্রয়োজন পড়ত না। হযরত আম্বিয়া আলাইহিমুস সালাম গণই পেরেছেন বিশ্ব প্রকৃতির সকল নিয়ম কানুনের আড়ালে যে হাকিকাত রয়ে গেছে তাহাকে পরিপূর্ণরূপে মানবজাতির সামনে উপস্থাপন করতে। কিন্তু লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, এই কাজের জন্য আম্বিয়া (আলাইহিমুস সালাম) দের বিজ্ঞান চর্চা করতে হয় নি। উল্লেখ্য যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম যে কিছুদিন হেরাগুহায় অতিবাহিত করেন উহাকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলে না।





      বিজ্ঞানের সবচে সাধারণ ছাত্রটির নিকটও ইহা সুস্পষ্ট। একটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দৃষ্টান্তও কেহ পেশ করতে পারবে না যে কোন একজন নবী আলাইহিস সালাম কোন ধরণের বিজ্ঞান চর্চা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেছেন। এই বিষয়টি মোটেও আকস্মিক নয়। মহান আল্লাহ্‌ পাক সম্পূর্ণ পরিকল্পনা মোতাবেক ইহা ঘটিয়েছেন যাতে মানুষ এই শিক্ষা নিতে পারে যে শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণা দ্বারা রাব্বুল আ’লামীনকে পূর্ণরূপে জানা যায় না। তাছাড়া আরো একটি রহস্য রয়েছে। কোন নবী আলাইহিস সালাম যদি বিজ্ঞান চর্চায় লিপ্ত হতেন, তাহলে উনার নবুওয়াত এবং ওহী প্রাপ্তির ওপর জনসাধারণ বিশ্বাস স্থাপন করত না। লোকেরা ওহীকে গবেষণা লব্ধ জ্ঞান বলে উড়িয়ে দিত। কারণ সাধারণভাবেই এটা মানুষের ধারণা যে বিজ্ঞানীরা আর দশজন থেকে আলাদা ধরণের কথাবার্তা বলে থাকেন। 
      অতএব, কোন একজন নবী আলাইহিস সালাম-ও যদি বিজ্ঞান চর্চায় লিপ্ত হতেন, তবে উনার নবুওয়াতকে মানুষ অস্বীকার করত এবং বলত যে এটাও এক ধরণের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফল। ফলে ওহীর যে মুলদাবী, সেটাই পেছনে পড়ে যেত। তাই দেখা যায় যে, নবীগণ ব্যবসা করেছেন, বাদশাহী করেছেন, চাকুরী করেছেন এমনকি রাখালিও করেছেন; কিন্তু বিজ্ঞান চর্চা করেন নি। আরও লক্ষ্যণীয় যে, নবী আলাইহিস সালাম গণের দাওয়াত পদ্ধতিও ছিল সহজ সরল। দ্ব্যর্থহীন এবং পরিষ্কার ভাষায় নবীগণ দাওয়াত দিয়েছেন সরাসরি তাওহীদ ও রিসালাতের প্রতি, ভয় দেখিয়েছেন আখিরাতের , জোর দিয়েছেন উনাদের পরিপূর্ণ অনুসরণের উপর; কিন্তু প্রথাগত বিজ্ঞান চর্চার দুরূহ পথে মানুষকে অগ্রসর হতে আহবান করেন নি । অথচ আজ আমরা (তথাকথিত ইসলাম প্রেমিক ও ইসলামী গবেষকরা) নবী শ্রেষ্ঠ মহানবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের প্রতি নাজেলকৃত ওহী অর্থাৎ আল-কুরআন কে বিজ্ঞানের বাঁধনে বাঁধার জন্য ওঠে পড়ে লেগেছি। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কী বা হতে পারে!

     কেহ হয়তো ভাবতে পারেন যে, এতসব যুক্তি তর্কের মাধ্যমে আমি মহাগ্রন্থ আল-কোরআনকে একটি অবৈজ্ঞানিক গ্রন্থ রূপে প্রমাণ করেতে চাচ্ছি। প্রিয় পাঠক! আমার উদ্দেশ্য উহা নয়। আমার বক্তব্য একদম পরিষ্কার। আমি পরিষ্কারভাবে বলছি, “আল কোরআন যেমন কোন বিজ্ঞান পুস্তক নয়, তেমনি ভাবে কোন অবৈজ্ঞানিক গ্রন্থও নয়।” আল-কোরআন হচ্ছে জীন-ইনসানের জন্য সর্বশেষ হেদায়েত গ্রন্থ যাহা এই জগতের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ্‌ পাকের তরফ থেকে অবতীর্ণ । মানুষ বৈজ্ঞানিক গ্রন্থ লিখতে পারে, অবৈজ্ঞানিক গ্রন্থও লিখতে পারে; কিন্তু পারে না কোন হেদায়েত গ্রন্থ রচনা করতে। কারণ হেদায়েতের মালিক কেবলমাত্র মহান আল্লাহ্‌ পাক। বলা হচ্ছে, “ তুমি যাহাকে ভালবাস ইচ্ছা করলেই তাহাকে হেদায়েত দিতে পারবে না। তবে আল্লাহ্‌ যাকে চান তাকে হেদায়েত দান করেন (২৮:৫৬)।”

      অতএব, কোরআন শরীফ কে হেদায়েত গ্রন্থ রূপে না দেখে, যারা বিজ্ঞান গ্রন্থ হিসাবে দেখছে, তারা প্রকৃতপক্ষে কোরআনের মর্যাদাহানি করছে । যেহেতু হেদায়েত হচ্ছে গোটা জিন্দেগীর জন্য একটি সার্বিক ব্যাপার, তাই মহান আল্লাহ্‌ পাক কোরআন শরীফে বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করেছেন এবং তাঁহার পবিত্র কালামকে বিবিধ বিশেষণে ভূষিত করেছেন, যেমন ‘জিকর’ , ‘তাজকেরা’, ‘কিতাবুম মুবীন’ ইতাদি। তদ্রুপ একটি বিশেষণের নাম ‘হাকীম’।কিন্তু এই ‘হাকীম’ শব্দের মাধ্যমে পবিত্র কোরআন শরীফকে একখানা বিজ্ঞান গ্রন্থ বানিয়ে দেবার যে চেষ্টায় অনেকে শামিল হয়েছেন সেটা স্রেফ মূর্খতা ও পণ্ডশ্রম। কারণ অন্যান্য নবী (আলাইহিস সালাম)দের ন্যায় আমাদের মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি পবিত্র দায়িত্ব ছিল ‘হিকমত’ শিক্ষা দেওয়া। হিকমতের অর্থ যদি বিজ্ঞান চর্চা হয়, তাহলে দেখা যায় যে সেই শিক্ষা তিনি দিয়ে যান নি। তবে কি নবী শ্রেষ্ঠ হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে পালন করেন নি ? আল্লাহ্‌ পাক আমাদেরকে রক্ষা করুন এমন ধৃষ্টতাপূর্ণ চিন্তা থেকে যাহা ইহকাল পরকাল উভয়টি বরবাদ করার জন্য যথেষ্ট। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌র নবী উনার উপর অর্পিত দায়িত্ব পুরোপুরি আদায় করে গেছেন; হিকমতও তিনি শিখিয়ে গিয়েছেন। তবে সেই হিকমতের অর্থ ‘বিজ্ঞান চর্চা’ ছিল না। অধিকন্তু মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলে গেছেন, “ আল্লাহ্‌ যার মঙ্গল চান, তাকে দ্বীনের বিষয়ে ফকীহ বানিয়ে দিন।” (বুখারী)। 


:সমাপ্ত : 

 লেখক:  
মোহাম্মদ সালেক পারভেজ
সহকারী অধ্যাপক,
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটি, ঢাকা ১২০৭  
ই-মেইল : sparvez@daffodilvarsity.edu.bd


প্রথম প্রকাশঃ ৬ জুলাই, ২০১৪ এবং ৮ জুলাই, ২০১৪ "দৈনিক ইনকিলাব" এ  ‘ইসলামী জীবন’ পাতায় দুই পর্বে প্রকাশিত হয়েছে।


 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন