Join Us On Facebook

Please Wait 10 Seconds...!!!Skip

গণিত অলিম্পিয়াড এবং বাংলাদেশ

অতি সম্প্রতি একটি অনুরোধ পত্র হাতে এসেছে। পত্রটি ঢাকাস্থ ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তরফ থেকে কয়েকটি টেবিল ঘুরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমার কাছে ( যেহেতু আমি বিষয়টির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত) এসে স্থিত হয়েছে যাতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করি।  পত্রের বিষয়বস্তু ইরানের রাজধানী তেহরানে আগামি আগস্টে অনুষ্ঠিতব্য ১৭তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড অংশগ্রহণ সম্পর্কিত। 


ইরানের   National Organization for Educational Testing (NOET) তত্ত্বাবধানে  এই প্রতিযোগিতাটি ২০০০ সাল থেকে ফি-বৎসর অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।  যেহেতু আমি গণিতের ছাত্র এবং পেশা হিসাবে গণিত পড়াই, সুতরাং বিষয়টি গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করলাম। অতঃপর লক্ষ্য করলাম
যে এ ধরণের প্রতিযোগিতায় আমার বা অন্য কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অংশগ্রহণ নিরর্থক কারণ যে সিলেবাসে অলিম্পিয়াডটি হবে উহা একমাত্র যারা শুধু গণিত নিয়ে Graduation করতে যান, তারাই পড়ে থাকেন। কিন্তু আরো দুঃখজনক বিষয় এটা যে এই মানের প্রতিযোগিতায় আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আদৌ আশাবেঞ্জক নয়। অথচ আমরা সবাই জানি যে  আমাদের দেশ হতে বেশ ঘটা করে প্রতি বৎসর IMO (International Mathematical Olympiad ) – তে অংশগ্রহণ করা হয়। সন্দেহ নেই যে, IMO -ই গণিত সংক্রান্ত যতগুলো প্রতিযোগিতা হয়, তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম। IMO - তে ভাল করা জাত গণিতবিদ হওয়ার লক্ষণ।IMO-তে ভাল ফল করেছে এমন অনেকেই (যেমন Perelman,Tao, Elkies, Mirzakhani প্রমুখ)  পরবর্তীকালে ভুবনবিখ্যাত গণিতজ্ঞ হয়েছেন। তবে IMO -র প্রতিযোগিতাটি বিশেষ ২টো শর্তযুক্তঃ (ক) বয়স অনধিক ২০ হতে হবে ; (খ) ৩য় পর্যায়ের অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী না হওয়া (উইকিপেডিয়ার ভাষায়ঃ Contestants must be under the age of 20 and must not be registered at any tertiary institution. Subject to these conditions, an individual may participate any number of times in the IMO. )২০০৫ সাল থাকে বাংলাদেশ নিয়মিত IMO-তে অংশ নিচ্ছে এবং ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বৎসর পদক পেয়ে আসছে। এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সফলতা ২০১ সালে ৯৭ পয়েন্ট পেয়ে ১১৪ টি টিমের মধ্যে ৩৩ তম হওয়াআমরা সামনে আরো ভাল ফলাফলের প্রত্যাশা করি।    

এবারে তেহরানে অনুষ্ঠিতব্য গণিত অলিম্পিয়াড সম্পর্কে কিছু আলোচনা করি।   এই প্রতিযোগিতার একটি বিশেষত্ব আছে যে উহাতে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্ররা ( সর্বোচ্চ ৪র্থ বৎসর অর্থাৎ level-4) অংশ নিতে পারে। গত ১৬ টি প্রতিযোগিতায় আজ পর্যন্ত বাংলাদেশ মাত্র একবার (২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত ৮ম আসরে) অংশ নেয়। অথচ পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা ২ বার করে অংশ নিয়েছে।প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে এ পর্যায়ে আমাদের এত অনীহা কেন ? এর উত্তর এক কথায় দেয়া যাবে না। তবে আমি কিছু বাস্তব অবস্থা বর্ণনা করতে চাই।  প্রথমতঃ যে কয়েক লাখ ছাত্রছাত্রী প্রতি বৎসর উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তাদের মধ্যে যারা সব থেকে মেধাবী তাদের থেকে ৮০% ভাগেরও বেশী বেছে নেয় বুয়েট, ঢামেক, ঢাবির সিএসই ইত্যাদি ( ২-৪ জন ব্যতিক্রম থাকতে পারে যাহা ধর্তব্য নয়) এটার পেছনে মূল কারণ এদেশের আর্থসামাজিক অবস্থা (মাঝে মাঝে মনে হয় Perelman কিম্বা Tao এদেশে জন্ম নিলে গণিতবিদ না হয়ে হয়তো বড় কোন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা আমলা হতেন) ফলে দেখা যায় যে, যে ছেলেটি স্কুলে অঙ্ক কষে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিত, সে হয়তো অংক থেকে বহু যোজন দূরে সরে গেছে। মেডিকেলে ভর্তি হওয়া ছেলেটি কিছুদিনের মধ্যে অংক ভুলে যায়। ইঞ্জিনিয়ারিং যারা পড়ে, তাদেরকে সিলেবাসের কারণে প্রচুর অংক করতে হয় বটে, কিন্তু যে নিয়মে তারা অংক শেখে তাতে ব্যুৎপত্তি অর্জিত হয় না। আর ওটা অর্জন করাটা তাদের জন্য মোটেও জরুরী নয়।সুতরাং তাদের পক্ষে বর্ণিত বা এ জাতীয় অলিম্পিয়াডে অংশ নেয়াটা অযৌক্তিক।    

সব ধরণের উচ্চতর গণিত একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গণিত বিভাগেই পড়ানো হয়ে থাকে।   অতএব, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর গণিত বিভাগে যারা ভর্তি হয়, তাদের বিষয়টি বিশদভাবে আলোচনার অবকাশ রাখে কিন্তু এখানেও উচ্চতর গণিতে যে ব্যুৎপত্তি দরকার সেটা ছাত্র থাকা অবস্থাতে হাতে গোণা ২-৪ জন ছাড়া বাকিদের আসে না।(ঐ ২-৪ জন যা কিছু অর্জন করে তা কেবল আত্ম-প্রণোদিত হয়ে নিজেদের নিরলস সাধনার ফলে )। এই না-অর্জনের মূল কারণ কয়েকটি।লেকচার-শিট প্রদান (যে কারণে শিক্ষার্থীরা বই পড়তে অনাগ্রহী হয়ে থাকে ) এবং গৎবাঁধা প্রশ্ন-প্রণয়ন (এর ফলে শিক্ষার্থীরা সুনির্দিষ্ট কিছু অনুশীলনীর বেশী চর্চা করে না)এই দুটোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। ইরানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিয়াডটির ওয়েবসাইটে (http://olympiad.sanjesh.org/EN/Content.aspx?ID=66 ) সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে একজন প্রতিযোগীকে কি কি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হবে। উদাহরণস্বরূপ আমি কেবল Mathematical Analysis শীর্ষক বিষয়টির কথা যৎসামান্য আলোচনা করছি। গণিতের একজন ছাত্রকে যে কয়টি ‘পেপার’ পড়তে হয়, ত্নমধ্যে এটিই কঠিনতম। উক্ত ওয়েবসাইটে এই ‘পেপারে’ একজন প্রতিযোগীর জন্য ‘রেফারেন্স’ রূপে দুটো বইয়ের নাম দেয়া আছেঃ (ক)Walter Rudin এর Principles of Mathematical Analysis  এবং (খ) R. G. Bartle এর Elements of Real Analysis . যেহেতু একটি আন্তর্জাতিক মানের অলিম্পিয়াড হচ্ছে, সুতরাং ধরে নেয়া যায় যে, উক্ত ২টি বই থেকে হুবহু কোন অংকই আসবে না। তবে এই ২টি বইতে যে সকল অনুশীলনী আছে, ঐগুলোকে যে ভালভাবে সম্পূর্ণ সমাধান করতে পারবে, তার যে পরিমাণ দক্ষতা অর্জিত হবে তাতে আশা করা যায় যে এই ধরণের অলিম্পিয়াডে সে নিশ্চিত ভাল করবে। এক্ষণে বাস্তবতা হচ্ছে যে Rudin এর  এর বইয়ের ২০% অনুশীলনীও এদেশের কোথাও করানো হয় না, যদিও বইটির নাম সব শিক্ষক প্রস্তাব করে থাকেন। তবে  উহা যেন অনেকটা প্রদর্শনীর নিমিত্তে, পড়ান অথবা শিখানোর জন্য নয়। আর Bartle এর বইটির নাম-টাও অনেক শিক্ষার্থী আদৌ শুনে নি, ঘাঁটাঘাঁটি করাতো দূরের কথা। সুতরাং এই পরিমাণ পড়াশুনা নিয়ে একটি উঁচুমানের আন্তর্জাতিক অলিম্পিয়াডে অংশ নিয়ে ভাল ফলাফলের প্রত্যাশা করা নিরবুদ্ধিতা।অতএব, অংশ না নেয়াটাই যেন সুবুদ্ধির পরিচায়ক!     

এখন আমাদেরকে এই দুরবস্থা থেকে বের হতে হবে। তবে তার জন্য প্রয়োজন পড়বে সার্বিক এবং সমন্বিত প্রচেষ্টার।দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের পেছনে  খুব একটা সময় দিতে  চান না, যেমনটা আমাদের সময়ে দিতেন। এমন ঘটনাও শুনেছি যে এমফিলে ভর্তি হয়ে পরে ছেড়ে দিতে হয়েছে কারণ শিক্ষক পাওয়া যায় নি (তাদের সময় নেই যেহেতু তারা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিচ্ছেন)। সুতরাং গণিত অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণে ইচ্ছুকদের পেছনে কে বাড়তি মেহনত করবে ? আসলে  অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার এদেশে এটা সম্ভব নয়।এক্ষেত্রে তারাই খাটতে পারবে যাদের রুটিরুজির চিন্তায় পেরেশান থাকতে হয় না। এজন্য দরকার ‘ফাণ্ডিঙ’ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার। তেহরানের সেই অলিম্পিয়াডটি ইরানের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রনাধীন। এবং শুধু এই কাজের জন্য ইরান সরকার একটি সংস্থা  (NOET)পর্যন্ত তৈরি  করেছে। জানিনা এদেশে তেমন কিছু সম্ভব হবে কী না । তবে এটা সত্যি যে, IMO-তে অংশগ্রহণে সহায়তা করার জন্য এদেশে অনেক সংস্থা এগিয়ে এসেছে। সুতরাং আরও উপরের পর্যায়ের অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণে সহায়তা করার জন্য অনেকেই এগিয়ে আসবে বলে আশা করা যায়। অবশ্য প্রাথমিক উদ্যোগ-প্রস্তাবনা ইত্যাদি শুরু করতে হবে এদেশের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের গণিত বিভাগগুলোকে এবং বাংলাদেশ গণিত সমিতিকে। দুনিয়াতে এটা নিয়ম যে,  যার কাজ তারে সাজে, অন্যে গেলে লাঠি বাজে। 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এদেশের শিক্ষাঙ্গনে অন্যতম যুগান্তকারী ঘটনা। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক কৃতিত্বের মধ্যে ইহাও একটি যে এখানে দীর্ঘসূত্রিতা নেই। ঝটপট যে কোন ধরণের প্রতিযোগিতা তারা করে ফেলতে পারে। সবগুলো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে একত্রে বিবেচনায় ধরলে, দেখা যাবে যে, প্রতি সপ্তাহে কোথাও না কোথাও কোন না কোন আঞ্চলিক/জাতিয়/আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এটাও অস্বীকার করার যো নেই যে, -৪ টি বাদে বাকি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে বিজ্ঞানের মূল বিষয়ভিত্তিক অর্থাৎ গণিত-পদার্থরসায়ন বিভাগগুলো নেই। অথচ এই বিভাগগুলো থাকলে এ সকল বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও উঁচু মানের গণিতবিদ-পদার্থবিদ-রসায়নবিদ বের হয়ে আসতকারণ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে  শিক্ষার্থীরা অনেক বেশী নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকে। এখানে শিক্ষকরা ছাত্রদের পেছনে প্রচুর সময় ব্যয় করে। সুতরাং দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায় যে যদি ৫০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগ থাকে এবং প্রতি টার্মে  ৩০ জন করে ছাত্র  থাকে, তবে যে কোন একটি টার্মে সর্বমোট ১৫০০ জন ছাত্র আছে। এদের মাত্র ১%ও যদি উঁচু দরের দক্ষতা অর্জনে সমর্থ হয়, তবে তেহরানের ঐ অলিম্পিয়াডে অথবা অনুরূপ মানসম্পন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আমরা উক্ত টার্ম থেকে  ১৫০০ এর ১% = ১৫ জন ভাল বরঞ্চ যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী পাচ্ছি। এভাবে সবগুলো টার্মকে বিবেচনায় ধরলে সংখ্যাটি আরো বড় হয়।  এদেশের ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নিক, বিশ্ববরেণ্য গণিতবিদ হোক, এই কামনা আমাদের সকলের। 



লেখক: শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক।

মোহাম্মদ সালেক পারভেজসহকারী অধ্যাপক ও কলামিস্ট
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটি, ঢাকা ১২০৭  
ই-মেইল : sparvez@daffodilvarsity.edu.bd
প্রথম প্রকাশঃ ৯ এপ্রিল ২০১৬ breakingnews.com.bd ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

              


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন