Join Us On Facebook

Please Wait 10 Seconds...!!!Skip

গোলাম মাওলা রনির একটি প্রবন্ধ ও কিছু কথা

গোলাম মাওলা রনি। একজন স্বনামধন্য সাবেক সংসদ সদস্য। বর্তমানে একজন বিশিষ্ট মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও লব্ধ প্রতিষ্ঠিত লেখক। জনাব রনির লেখার উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, লেখাগুলো গভীর চিন্তাপ্রসুত। বোঝা যায় যে, প্রতিটি লেখার পেছনে প্রচুর পড়াশুনা আছে। কিছু লেখা তো এক কথায় অসাধারণ। তার ‘এক পাগলা রাজা এবং ডাইনি মায়ের ইতিকথা!’লেখাটি (দৈনিক নয়া দিগন্ত, ১১-০৩-২০১৪) আমি বিশেষভাবে সংগ্রহে রেখেছি।

তারপরও জনাব রনি একজন মানুষ। আর আম্বিয়া আলাইহিস সালামগণ ব্যতীত কোনো মানুষই ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। জনাব রনির সাম্প্রতিক একটি লেখাতে বেশ বড় মাত্রার কিছু ভুল হয়ে গেছে। সেই লেখাটি একটি প্রবন্ধ। যার শিরোনাম ‘স্রষ্টার পক্ষ থেকে যখন শাস্তি আসে’(দৈনিক নয়া দিগন্ত, ২২-০৪-২০১৪)। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই আলোচনা।

তির্যক সমালোচক হিসাবে নয়, বরং একজন সহৃদয় পাঠক এবং সর্বোপরি একজন মুসলমান ভাই হিসাবে বিবেক তাড়িত হয়ে আমার এই কলম ধরা।


পরম সত্য
প্রথমে একজন মানুষের জানা কর্তব্য যে চরম ও পরম সত্য কি? প্রতিটি মুসলমানের কাছে চরম ও পরম সত্য হচ্ছে আল-কুরআন এবং আল-হাদীস । এই দুই মহান বিষয়ের বিপরীতে যাই পাওয়া যাক না কেন, মুসলমান মাত্রই সেটাকে ভাগাড়ে ফেলে দেয়। সেই বিপরীত জিনিসটির পেছনে যতই শক্তিশালী যুক্তি-প্রমাণ থাকুক না কেন, সেই প্রমাণ হোক ঐতিহাসিক অথবা বৈজ্ঞানিক এমনকি চাক্ষুষ, একজন নিষ্ঠাবান মুসলমানের কাছে কুরআন-হাদীসের বিপরীত বিষয় ষোলো আনাই মূল্যহীন। এই বিষয়টি জনাব রনিও জানেন এবং মানেন । কারণ যদ্দুর জানি তিনিও একজন নিষ্ঠাবান মুসলমান।

হযরত মুসা (আ.)এর শৈশব
উক্ত প্রবন্ধে জনাব রনি লিখেছেন, ‘উপকথা অনুযায়ী জন্মের পর শিশু মুসা আ. এই ফেরাউনের রাজপ্রাসাদেই আশ্রয় পেয়েছিলেন।’অথচ বিষয়টি মোটেও তা নয়।

পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে-‘আমি মূসা-জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাক। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশংকা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব।

অতঃপর ফেরাউন পরিবার মূসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যান। নিশ্চয় ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল।

ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোনো খবর ছিল না।’ ( ২৮:৭-৯)

সুরা ত্বাহাতেও এই সম্পর্কে বর্ণনা আছে। সুতরাং এই সত্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, মহান আল্লাহ্‌ পাকের কুদরতে হযরত মুসা (আ.) তার আজন্ম শত্রু ফেরাউনের গৃহেই প্রতিপালিত হয়েছিলেন। এই বিষয়টিকে উপকথা/রূপকথা/গল্প ইত্যাদি বললে কিংবা এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই এমন কিছু বললে অথবা ভাবলে সেক্ষেত্রে আর কোনো ক্ষতি হবে কি না জানি না, তবে ঈমানটা নষ্ট হয়ে যাবে।

কোন ফেরাউন
জনাব রনি আরেকটি বিভ্রান্তি তৈরি করেছেন ফেরাউনের পরিচয় নিয়ে। এটা সত্য বটে সেকালে মিশরের সকল শাসকদেরকে ফেরাউন বলা হতো। জনাব রনির মতে হযরত মুসার (আ.) পশ্চাৎ ধাবনকারী ফেরাউন আর হযরত মুসার (আ.) জন্মগ্রহণের সময়কার ফেরাউন এক ব্যক্তি নয়।

লেখকের ভাষায়, ‘হজরত মুসার (আ.) জীবনকালে মোট নয়জন ফেরাউন মিসর শাসন করেন। ... হজরত মুসা যখন জন্ম নিলেন, তখন মিসর শাসন করতেন তৃতীয় আমেনহোতেপ। ...এর পরই আসেন দ্বিতীয় রামেসিস, যার রাজত্বকাল ১২৭৯ থেকে ১২১৩ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ পর্যন্ত। ধারণা করা হয়, দ্বিতীয় রামেসিসের সাথেই হজরত মুসার (আ.) দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেঁধেছিল ।’

অথচ পবিত্র কুরআনের বর্ণনার সাথে এই কথা পুরোপুরি সাংঘর্ষিক । হযরত মুসা (আ.) নবুওয়াত পাওয়ার পরে যখন ফেরাউনকে দাওয়াত দিলেন, তখনকার পরিস্থিতি পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে-

ফেরাউন বলল, ‘আমরা কি তোমাকে শিশু অবস্থায় আমাদের মধ্যে লালন-পালন করিনি? এবং তুমি আমাদের মধ্যে জীবনের বহু বছর কাটিয়েছ ।’(২৬:১৮)

এত্থেকে খুব সহজেই বোধগম্য হ্য় যে উভয় ফেরাউন একই ব্যক্তি ছিল।

এ প্রসঙ্গে জনাব রনি লিখেছেন,
‘আমি মিসর গিয়েছি এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও ঐতিহাসিক দলিলপত্র দেখেছি।’

এখানেও সেই একই কথা প্রযোজ্য । ইতিহাসের বর্ণনা, জাদুঘরের আর্কাইভে সংরক্ষিত দলিলপত্র যদি পবিত্র কুরআনের কিংবা হাদিসের বর্ণনার বিরুদ্ধে যায়, তবে ঐ সমস্ত যুক্তি-প্রমাণ পুরোপুরি পরিত্যাজ্য ।

বেহুদা গবেষণা
মহান আল্লাহ্‌ পাকের তরফ থেকে মানব জাতির জন্য শ্রেষ্ঠতম অনুদান হচ্ছে আল কুরআন। আর আল কুরআনের ব্যাপারে মৌলিক কথাটি হচ্ছে, আল কুরআন একটি হেদায়েত গ্রন্থ। হেদায়েতের সহজ সরল মানে হল, কিভাবে জিন্দেগী গঠন করলে দুনিয়া-আখেরাতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ্‌ পাকের সন্তুষ্টি অর্জন করা যাবে, না-রাজি ও আজাব থেকে বাঁচা যাবে। পবিত্র কুরআনে যত কিছুই বর্ণনা করা হয়েছে সকল কিছুরই মূল উদ্দেশ্য হেদায়েত অর্জন। বিভিন্ন নবীদের ঘটনা বর্ণনার উদ্দেশ্যও কিন্তু হেদায়েত। আর হেদায়েত অর্জনের সাথে দিন-তারিখ-সাল ইত্যাদির কোনো সম্পর্ক নেই। এই কারণেই সর্বজ্ঞানী মহান আল্লাহ্‌ পাক একটি ঘটনার ক্ষেত্রেও দিন-তারিখ উল্লেখ করেন নি। কারণ তাহলে মানুষ ঘটনা থেকে হেদায়েত না নিয়ে, ঘটনার ঐতিহাসিক তথ্য অনুসন্ধানে মগ্ন হয়ে যেত। কেউ ঐগুলোকে প্রমাণ করত, কেউ অপ্রমাণ করতে চাইতো, গবেষণার পর গবেষণা হতো, জনে জনে মাস্টার্স, পিএইচডি করত; কিন্তু হেদায়েত অর্জিত হত না। অতএব, তা কুরআন শরীফের মূল মাকসাদের পরিপন্থী হতো। আসলে এটা পবিত্র কুরআনের একটি মু’যিযা যে, দিন তারিখ ব্যতীত ঘটনা বর্ণনা করা হচ্ছে ; যেখানে মানব রচিত ইতিহাসের প্রথম পাঠই হল, ঘটনা কখন ঘটেছিল। আর এজন্যই ইতিহাস পড়ে কেউ কোনদিন হেদায়েত পায় নি। হেদায়েত তো বহুত দুরের কথা, জার্মান দার্শনিক হেগেলের মতে, ‘... ইতিহাস আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয় যে, ইতিহাস থেকে কেউ কোনোদিন শিক্ষা নেয় না।’ অথচ নাযিল হওয়ার পর থেকে কত কত লোক যে পবিত্র কুরআনের উসিলায় বিগত ১৪শ' বৎসরে হেদায়েত পেয়েছে এবং আগামি দিনগুলোতেও পেতে থাকবে তার হিসাব নেই।

উপসংহার
জনাব রনির প্রবন্ধটি অতলস্পর্শী। এই ধরনের হৃদয়ছোঁয়া আরেকটি লেখা ‘তিস্তা বাঁধ-বাংলাদেশের মারণফাঁদ এবং ইমাম বুখারি ’ শিরোনামে তিনি ২৯-৪-২০১৪ তে দৈনিক নয়া দিগন্তের মাধ্যমে পাঠককে উপহার দিয়েছেন। আশা করি এই ধরনের উচ্চমার্গের লেখা তিনি আরও উপহার দিতে থাকবেন । তবে একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ, ‘মোগল হেরেম’ নিয়ে যে ‘রাবিশ’ লেখাটি তিনি লিখছেন, সেটি যেন বাদ দেন। যতটুকু বুঝতে পারি, জনাব রনি নোংরা নন, নোংরামি পছন্দ করেন না। তাহলে কি দরকার নোংরা বিষয় নিয়ে লেখালেখি করার?
আমাদের আলোচনাধীন প্রবন্ধটি ছিল আসমানি গজব নাজেল সংক্রান্ত বিষয়ে । এই প্রসঙ্গে কুরান-হাদীস থেকে সামান্য কিছু উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি-

(১) ‘...এবং আমি জনপদসমূহকে তখনই ধ্বংস করি, যখন তার বাসিন্দারা জুলুম করে।’ (২৮:৫৯)

(২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,‘মজলুমের দু'আ মেঘের উর্ধ্বে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং তার জন্য আকাশের দ্বারগুলো খুলে দেয়া হয়।’আর মুবারক ও মহান প্রতিপালক বলেন, ‘আমার ইযযতের কসম! দেরিতে হলেও নিশ্চয়ই আমি তোমায় সাহায্য করব।’ (ইবনে হাব্বান )

(৩) ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন- জালেম ও বিদ্রোহী হইও না; কারণ মহান আল্লাহ্ বলেন, 'নিশ্চয়ই তোমাদের জুলম তোমাদের নিজেদের প্রতিই আপতিত হবে।’ (হাকেম )

লেখক:

মোহাম্মদ সালেক পারভেজ
সহকারী  অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভারসিটি, ঢাকা ১২০৭  
ই-মেইল: sparvez@daffodilvarsity.edu.bd

বাংলাদেশ সময়: ১৫১৫ ঘণ্টা, ২৫ মার্চ ২০১৩
১ম প্রকাশঃ ১৭ মে ২০১৪, ৬:০০ অপরাহ্ন ; http://breakingnews.com.bd ওয়েববসাইটে
গোলাম মাওলা রনির একটি প্রবন্ধ ও কিছু কথা  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন